ইভ্যালিতে প্রতারিত হবেন না

সর্বশেষ আপডেট:

বাংলাদেশে প্রথম সারির জনপ্রিয় একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান হলো ইভ্যালি। বিভিন্ন অফারের মাধ্যমে খুব কম দামে পণ্য দিয়ে এটি বেশ অল্প সময়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। তবে কাস্টমারদের ভোগান্তি ও অভিযোগেরও অন্ত নেই। বিশেষ করে দেরিতে ডেলিভারি পাওয়া একটি সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে বাজে পণ্য পাওয়াসহ সাপোর্ট সংক্রান্ত সমস্যা তো রয়েছেই। তাই চটকদার বিজ্ঞাপনে বিমূঢ় হয়ে কিংবা অফারের মোহে পড়ে সাথে সাথে অর্ডার করা যাবে না। তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজOffer, Help & Review গ্রুপে বিভিন্ন কমেন্ট দেখে, বুঝে-শুনে তারপর অর্ডারের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

প্রতারণা এড়াতে লক্ষ্যণীয়:

ইভ্যালিতে আমার অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু বিষয় শেয়ার করছি। আশা করি এগুলোর প্রতি লক্ষ্য রেখে কোনো অর্ডার করলে প্রতারণা অনেকটা এড়ানো যাবে। সেই সাথে পণ্য কিনে সত্যিকারভাবে লাভবান হওয়া যাবে।

  1. জরুরীভাবে পণ্য না কেনা:
    এই মুহূর্তে কিংবা কয়েক দিনের মধ্যে প্রয়োজন পড়বে, এ ধরনের জরুরী অর্ডার করা যাবে না। আবার কিছু পণ্য আছে যেগুলো সময়মতো না পেলে পরবর্তীতে আর কাজে লাগে না। সেগুলোও অর্ডার করা যাবে না। যেমন, আমার বাচ্চার জন্যে ডায়াপারের অর্ডার করেছিলাম। বাচ্চা বড় হয়ে যাচ্ছে, ডায়াপারের আর কোনো খবর নেই।… পেমেন্ট করার ৩ থেকে ৬ মাস পর পণ্য পাবো, এ ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে অর্ডার করলে পরবর্তীতে আর টেনশন করতে হবে না। 😉
  2. ক্যাশব্যাকে পণ্য না কেনা:
    আমার মতো যারা ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ইত্যাদি এলাকার বাইরে থাকেন, তাদের ক্যাশব্যাক অফারে পণ্য না কেনাই ভালো। কেননা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই/এলাকাতেই ক্যাশব্যকের টাকা লাভজনকভাবে কাজে লাগানো (Utilize) যায় না। রেগুলার শপ থেকে কেনার ক্ষেত্রে ৬০% পেমেন্ট ক্যাশব্যাকের টাকা থেকে করা যায়। কিন্তু রেগুলার শপগুলোতে পণ্যের দাম অনেক বেশি হওয়ায় সব মিলিয়ে তেমন কোনো লাভই থাকে না।
  3. ডিসকাউন্ট অফারে পণ্য কেনা:
    সরাসরি ডিসকাউন্ট অফারে (যেমন-সাইক্লোন, আর্থকোয়াক, ফ্ল্যাশ আওয়ার ইত্যাদি) পণ্য কেনা যেতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে সেলার বেছে বেছে পণ্য কিনতে হবে। আর দেরিতে পণ্য পাওয়ার প্রস্তুতিও নিয়ে রাখতে হবে।
  4. সেলার বেছে কেনা:
    সব সেলার খারাপ না। আবার সব সেলার ভালোও না। ইভ্যালিতে পুরনো ও ব্যবহৃত জিনিস পাওয়ার অভিজ্ঞতাও আমার হয়েছে। তাই বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে অন্যদের অভিজ্ঞতা দেখে, ভালো সেলার থেকে পণের অর্ডার দিতে হবে।
  5. ব্র্যান্ডের পণ্য কেনা:
    সবচে’ ভালো হয়, ইভ্যালির সাথে যেসব ব্র্যান্ডের সরাসরি চুক্তি রয়েছে, তাদের থেকে পণ্য কেনা। তাহলে স্বল্পসময়ে মানসম্মত পণ্য পাওয়ার আশা করা যায়।
  6. রেগুলার শপ থেকে পণ্য না কেনা:
    রেগুলার শপে সাধারণত দাম অনেক বেশি দেয়া থাকে। তাই ইভ্যালি ব্যালেন্সে ক্যাশ ব্যাকের টাকা না থাকলে, অর্থাৎ কার্ড, বিকাশ, নগদ ইত্যাদির মাধ্যমে পুরো পেমেন্ট করতে হলে রেগুলার শপ থেকে না কেনাই ভালো। “রেগুলার শপ থেকে তাড়াতাড়ি পণ্য পাওয়া যায়” – আমার এ ধরনের একটা ধারণা ছিলো। তবে আমার নিজেরই একটি অর্ডার দুই মাসেও ডেলিভারি পাইনি।
  7. অফারে পেমেন্ট করা:
    পেমেন্টের ক্ষেত্রেও ইভ্যালিতে একেক সময় একেক অফার থাকে। কখনো ব্যাংক কার্ডে পেমেন্টে ডিসকাউন্ট তো কখনো আবার নগদ-বিকাশে ডিসকাউন্ট। তাই কোন্ মাধ্যমে, কীভাবে পেমেন্ট করলে ডিসকাউন্ট পাওয়া যাবে তা জানতে হবে।
  8. ডেলিভারি অ্যাড্রেস:
    মালামালের ওজন যদি ১০ কেজির উপর হয়, সেক্ষেত্রে কাস্টমারকে ডেলিভারি চার্জ বহন করতে হয়। আবার অনেক কুরিয়ার বড়ো মালগুলো হোম ডেলিভারি দেয় না। সংশ্লিষ্ট কুরিয়ারের অফিসে গিয়ে মাল রিসিভ করে আনতে হয়। যেহেতু ইভ্যালি কোন্ কুরিয়ারে পণ্য পাঠাবে তার ঠিক নেই, তাই ভারী পণ্যের ক্ষেত্রে এমন ডেলিভারি অ্যড্রেস ব্যবহার করতে হবে, যার কাছাকছি অনেক কুরিয়ারের অফিস রয়েছে। যেমন, আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলায় থাকি। এখানে সুন্দরবন আর কন্টিনেন্টাল ছাড়া আর কোনো কুরিয়ারের অফিস নেই। তাই ভারী মালগুলো প্রায়ই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গিয়ে রিসিভ করতে হয়। আশুগঞ্জের সাথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সড়ক যোগাযোগ ভালো নয়, আবার দূরত্বও তুলনামূলকভাবে বেশি বলে আমরা ভৈরব, কিশোরগঞ্জ ঠিকানা ব্যবহার করি। ভৈরব একটি উপজেলা হলেও সেখানে অনেক কুরিয়ারের আফিস রয়েছে। আর মেঘনা নদীর অপর পাড়েই ভৈরব।

ইভ্যালি সম্পর্কে আমি মোটামোটিভাবে ভালো ধারণা পোষণ করতাম। অনেকের মতো আমারও তাদের বিজনেস মডেল সম্পর্কে পরিষ্কার কোনো ধারণা নেই। তারপরও এতটুকু মনে হতো যে, তারা আমার টাকা নিয়ে ব্যবসায় খাটিয়ে লাভ করছে, এবং সেই লাভের একটা অংশ ক্যাশব্যাক, ডিসকাউন্ট ইত্যাদি হিসেবে দিচ্ছে। খুবই সহজ হিসাব। আর এ জন্যই ইভ্যালিকে অন্যদের থেকে আলাদা মনে করতাম। কিন্তু গতকাল (১৬.১১.২০২০ ইং) একটি পুরনো রুটিমেকার পেয়ে ইভ্যালির প্রতি আমার আস্থা উঠে গিয়েছে।

ইনভয়েস নাম্বার: EVL191298752
সেলার: Baahon Home Appliance
ক্যাম্পেইন: Cyclone Oct 30

প্যাকিং খুলে রুটি-মেকারটি দেখে প্রথম ইম্প্রেশন ছিলো “ব্যবহার-করা জিনিস পেয়েছি”। যেনো কোনো ভাঙ্গারি দোকান থেকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। জায়গায় জায়গায় মরচে ধরা আর দাগ-ময়লায় একাকার। দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে রুটি-মেকারটি বেশ পুরনো। ইভ্যালি খারাপ মাল দেয় না – এ (সু)ধারণাটাই পাল্টে গেলো। সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিস দেয়া হবে তা ক্যাম্পেইনে উল্লেখ করা উচিত ছিলো।

ইভ্যালিতে আমি যেসব সমস্যার/প্রতারণার সম্মুখীন হয়েছি:

ইভ্যালিতে অনেকেই বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন এবং হচ্ছেন। আবার বিভিন্নভাবে প্রতারিতও হচ্ছেন। তো আমি এখন পর্যন্ত যেগুলোর সম্মুখীন হয়েছি:

  1. কাঙ্ক্ষিত সময়ের মধ্যে ডেলিভারি না পাওয়া।
  2. পণ্য সম্পর্কে রেগুলার আপডেট না পাওয়া।
  3. সাপোর্ট পেতে দেরি হওয়া। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুধু আশ্বাস পাওয়া, কিংবা একেবারেই সাপোর্ট না পাওয়া।
  4. ব্যবহৃত ও পুরনো মালামাল পাওয়া।
  5. ক্যাশ ব্যাকের টাকা সহজে ব্যবহার করতে না পারা।
  6. হোম ডেলিভারি না পাওয়া।

ইভ্যালি সম্পর্কে কিছু কমেন্ট:

ইভ্যালি সম্পর্কে কিছু কমেন্ট:

  1. মিথ্যা কথা বলা, প্রলোভন দেখানো এগুলো হলো ইভ্যালির ব্যবসার পুঁজি।
  2. ইভ্যালির কুয়িক ডিল ও ফ্ল্যাশ আওয়ার সম্পর্কে বলতে হয়, যে কিনা ৪৫ দিন সময় নিয়েও পণ্য ডেলিভারি দিতে পারে না, সে কীভাবে ২/১৫ দিন সময়ে পণ্য ডেলিভারি করবে? এটা মানুষ কীভাবে বিশ্বাস করে?
  3. নতুন অর্ডারের টাকা নিয়ে পুরনো অর্ডারের ডেলিভারি দেয়। ফলে ইভ্যালিতে টাকা জমছে, আর সেই সাথে পেন্ডিং অর্ডারের সংখ্যাতো বাড়ছেই।

ইভ্যালির প্রতি আমার চাওয়া ও পরামর্শ:

যে কোনো প্রতিষ্ঠানেরই ভালো-খারাপ দুটি দিকই থাকতে পারে। খারাপ বিষয়গুলো কাটিয়ে ভালোর দিকে এগুনোই সবার লক্ষ্য। ইভ্যালিরও নিজস্ব কিছু সমস্যা রয়েছে, রয়েছে তার সমাধানও। সকল সমস্যা ও প্রতিকূলতা কাটিয়ে সে সবার আস্থা অর্জন করুক সেটাই মনেপ্রাণে আশা করি। এ ক্ষেত্রে আমার কিছু আইডিয়া:

  1. আনলিমিটেড অর্ডার না নেয়া। লোকবল অনুযায়ী যতটুকু সামলাতে পারবে ততটা অর্ডারই নেয়া।
  2. সত্যিকারভাবে যত দিনের মধ্যে পণ্য ডেলিভারি দিতে পারবে তা উল্লখ করা। অযথা কম সময়ের মধ্যে ডেলিভারির কথা বলে কাস্টমারদের হয়রানি না করা।
  3. অর্ডারকৃত পণ্য সম্পর্কে কাস্টমারকে নিয়মিতভাবে আপডেট/নোটিফিকেশন দেয়া। যেমন, বিদেশী পণ্য হলে তা বাংলাদেশে পৌঁছেছে কিনা, ডেলিভারি পেতে আনুমানিক আর কত দিন লাগতে পারে, কুরিয়ারের জন্য প্যাকিং করা হচ্ছে কিনা ইত্যাদি।
  4. পণ্যের কোয়ালিটি নিশ্চিত করা। বিশেষ করে সেলাররা যেনো সঠিক ও ভালো জিনিসটিই দেয় তা নিশ্চিত করা।
  5. কাস্টমার সার্ভিসকে আরো উন্নত করা। এজন্য লোকবল বাড়ানো, তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া সহ আরো যা যা করণীয় সব করা।
  6. কাস্টমারদের ফিডব্যাক ও জরিপের ব্যবস্থা করা। ফলে ঘাটতির জায়গাগুলো সহজেই চিহ্নিত করা যাবে।
শেয়ার, কমেন্ট, মেইল বা প্রিন্ট করুন

Leave a Reply