ঘরে বসে অনলাইনে আয়ের উপায়

সর্বশেষ আপডেট:

আমার পরিচিত এক ভাইয়ের কম্পিউটারের দোকার আছে। তার দোকানে কয়েকটা কম্পিউটার আছে। সেখানে তিনি টাইপিং, ছবি থেকে ছবি, অনলাইনে চাকরির আবেদন ইত্যাদি সেবাগুলো দিয়ে থাকেন। কিন্তু করোনার কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেকান বন্ধ রাখতে হচ্ছে। তাই আমার কাছে অনলাইনে আয় সম্পর্ক জানতে চেয়েছিলেন যেনো অযথা সময় নষ্ট না করে তার রিসোর্সগুলো কাজে লাগাতে পারেন। আমি চিন্তা করে দেখলাম এটা শুধু তার একার নয়, করোনাময় এমন পরস্থিতিতে হাজারো মানুষের একই প্রশ্ন, “ঘরে বসে ইন্টারনেটের মাধ্যমে কীভাবে আয় করা যায়?” তাদের যেনো সামান্য হলেও উপকার হয় তার জন্যেই এই নিবন্ধের অবতারণা।

ঘরে বসে আয়ের মর্মার্থ:

বাংলায় “বসে থাকা” বলতে “কোনো কাজ না করা” বুঝায়। কেউ যদি মনে করেন যে কোনো কাজ না করে, কিংবা কয়েকটা ক্লিক করে ঘরে বসে বসেই আয় করবেন তাহলে তাদের জন্য এই নিবন্ধ নয়। এই নিবন্ধ তাদের জন্য যাদের কাজ করার প্রবল আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও ঘরে বসে থেকে আযথা সময় নষ্ট করতে হচ্ছে।

যেসব কাজ অনলাইনে করা যায়:

অনলাইনে করা যায় এমন কাজগুলোকে “ডিজিটাল পণ্য” এবং “অনলাইন সেবা” এই দুই ভাগে ভাগ করা যায়। “ডিজিটাল পণ্য”-এর মধ্যে রয়েছে ওয়েব ডিজাইন, গ্রাফিক্স ডিজাইন, লোগো ডিজাইন, কন্টেন্ট রাইটিং, সফটওয়্যার তৈরি ইত্যাদি। “অনলাইন সেবা”-এর মধ্যে বিভিন্ন ধরণের কন্সালটেন্সি সার্ভিস, আইনি সহায়তা ইত্যাদি রয়েছে।

নিজেকে জেনে/চিনে এগোই:

অনলাইনে কাজগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাইরের দেশের, আরো নির্দিষ্ট করে বললে ইউরোপ-আমেরিকা ভিত্তিক হয়ে থাকে। এজন্য “স্পোকেন ইংলিশ”-এ ভালো দক্ষতা থাকলে সবচে ভালো হয়। অন্ততপক্ষে ইংরেজিতে চ্যাটিংয়ে স্বচ্ছন্দ হতে হবে। নতুবা কাজ পেতে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে।

ঘরে বসে কাজ করার অনেক ক্ষেত্র রয়েছে। একজনের পক্ষে সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়া সম্ভব না। আবার আমি যেসব কাজ জানি সেগুলো হয়তো অনলাইনে করা সম্ভব নয়। এজন্য কাজ শুরুর পূর্বে নিজের জ্ঞান, সামর্থ, অভিজ্ঞতা, আগ্রহ, ধৈর্য ইত্যাদি যাচাই করা প্রয়োজন। অনলাইনে আয়ের ক্ষেত্রে মুখ্য হচ্ছে আগ্রহ আর ধৈর্য। অনেক কাজের নিয়ম হয়তো আমার জানা নেই। কিন্তু আগ্রহ আর ধৈর্য থাকলে যেকোনো কাজ শিখে ফেলা এবং ঐ কাজে লেগে থাকা সম্ভব। অন্যদিকে এ দুটি না থাকলে কোনো কাজে আমি যতই অভিজ্ঞ হইনা কেন কাজ করতে করতে এক সময় ঐ কাজে বিরক্তি এসে যাবে। এজন্য কোনো কাজে, যেমন ওয়েব ডিজাইনে যদি আগ্রহ না থাকে, কিংবা আগ্রহ থাকলেও পর্যাপ্ত ধৈর্য না থাকে তাহলে অনলাইনে আয় করা বিষয়টি জেগে জেগে স্বপ্ন দেখার (দিবাস্বপ্ন) মতোই হয়ে দাঁড়াবে।

প্রাথমিকভাবে যা প্রয়োজন:

অনলাইনে কাজ করতে গেলে আবশ্যকীয়ভাবে ‌ইন্টারনেট সংযুক্ত একটি কম্পিউটার লাগবে। এবং অবশ্যই কম্পিউটার পরিচালনা সম্পর্কিত সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন। আমি যদি কম্পিউটার চালাতেই না পারি তাহলে এর মাধ্যমে আয় করার আশা করতে পারি না। ইংরেজিতে টাইপের ক্ষেত্রে অন্ততপক্ষে মোটামোটি গতি থাকা প্রয়োজন।

এছাড়া কাজ সংশ্লিষ্ট ও আনুষঙ্গিক বিভিন্ন সফটওয়্যার প্রয়োজন পড়বে। যেমন-

  • ওয়েব ব্রাউজার: অ্যাকাউন্ট খোলা, ওয়েবসাইট ব্রউজিং, ইমেইল চেক করা ইত্যাদি কাজের জন্য।
  • চ্যাটিং অ্যাপ: ক্লায়েন্টদের সাথে কথা বলা, চ্যাটিং, ফাইল শেয়ারিং ইত্যাদির জন্য।
  • গুগল ড্রাইভ, ড্রপবক্স ইত্যাদি: বড় ফাইল শেয়ার করার জন্য।
  • প্লেইন টেক্সট এডিটর, এডোবি ফটোশপ ইত্যাদি: ওয়েব ডিজাইনের জন্য।
  • এডোবি ফটোশপ, ইলাস্ট্রেটর ইত্যাদি: গ্রাফিক্স ডিজাইনের জন্য।

ঠিক কোন্ কাজটি করবো:

নিজের সক্ষমতা ও অনলাইনে কাজের সুযোগ ইত্যাদি সবকিছু (Overall) মিলিয়ে ঠিক করি কোন কাজটা আমার জন্য সবচে বেশি উপযোগী। প্রয়োজনে যে বিষয়ে আমার আগ্রহ আছে সে বিষয়টা ভালোভাবে শিখে নিয়ে কাজে নেমে পড়ি। তবে মনে রাখতে হবে সব কাজে আয় সমান নয়। আবার একেক কাজের চাহিদা একেক রকম। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হলো, ওয়েব ডিজাইন এবং গ্রাফিক্স ডিজাইনের চাহিদা সবচে বেশি। এগুলো শেখাও মোটামোটিভাবে সহজ। আয়ও মোটামোটি ভালো। এগুলোতে নিজের ক্রিয়েটিভিটি দেখানোর সুযোগ রয়েছে। এর সাথে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ওয়েব প্রোগ্রামিং ইত্যাদি শিখে আয় বাড়াতে পারি। অন্যদিকে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টে আয় বেশি হলেও চাহিদা/সংখ্যা কম। আর ডাটা এন্ট্রিতে কাজ বেশি, আয় কম।

প্লাটফর্ম বাছাই করি:

অনলাইনে আয় করার জন্যে হাজারো প্লাটফর্ম/সাইট রয়েছে। তবে বুঝে-শুনে তবেই অ্যাকাউন্ট খোলা উচিত। নতুবা প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অনলাইনে কাজ করার জনপ্রিয় কয়েকটি সাইটের নাম এখানে দেয়া হলো।

লক্ষ্য বহুদূর:

অনলাইনে অ্যাকাউন্ট খুললেই যে কাজ পেয়ে যাবো আর আয় শুরু হয়ে যাবে, বিষয়টা এতোটা সহজ নয়। শুরুরও শুরু আছে। মূল কাজ করার আগেও অনেক কাজ করতে হয়। প্রথম প্রথম অনলাইনে কাজ পেতে গেলে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। কেননা অনলাইনের ভার্চুয়াল জগতে কেউ কাউকে চেনে না। কারো সম্পর্কে কিছু জানে না। সুতরাং আবেগি হয়ে কোনো ক্লায়েন্ট কাজ দেয়ার প্রশ্নই উঠে না। এছাড়া পুরনো ও ভালো ফিডব্যাকওয়ালা প্রোফাইধারীদের রেখে আমার মতো নাবগতকে কেনো কাজ দেবে? কেননা এক্ষেত্রে ক্লাইয়েন্টেরও সঠিক সময়ে কাজ না পাওয়া কিংবা মানসম্মত কাজ না পাওয়া ইত্যাদি  অনেক ধরনের ঝুঁকি থাকে।

এজন্য প্রথমদিকে আমাদের প্রোফাইলকে যতো বেশি সম্ভব  সমৃদ্ধ করতে হবে। নিচের কাজগুলো আমরা করতে পারি:

  • ভালো কভার লেটার তৈরি করা।
  • উল্লেখযোগ্য ও মানসম্মত কাজ শোকেস করে রাখা।
  • পরিচিতজনদের মধ্য থেকে ভালো প্রোফাইল রয়েছে এমন কারো সাথে যোগাযোগ করা। তিনি যেন তার ক্লায়েন্টদের কাছে আমাকে রেফার করেন।
  • নতুন কাজ পেলে যথাসময়ে করে দেয়া। কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিতভাবে ক্লায়েন্টদের আপডেট দেয়া।
  • কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান থাকা। সততার সাথে কাজ করা।
  • ক্লায়েন্টদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।
  • যথাসম্ভব ক্লায়েন্টের থেকে ভালো ফিডব্যাক পাওয়ার চেষ্টা করা।

পরিশেষে বলতে চাই, ঘরে বসে অনলাইনে আয় করাটা খুব মুখরোচক শোনালেও কাজ করার পথটা এতোটা সহজ নয়। অনলাইন করা যায় এমন কোনো কাজ জানা থাকলে মোটামোটিভাবে ছয় মাসের লক্ষ্য নিয়ে আমাদের এগোতে হবে। আর জানা না থাকলে, আগে নির্বাচন করতে হবে কোন কাজটা আমরা জন্য বেশি উপযোগী। সে অনুযায়ী আগ্রহের সাথে কাজটি শেখার যথেষ্ট চেষ্টা করতে হবে। মোটকথা ধৈর্য ধরে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, কাজের সাথে লেগে থাকতে হবে।

শেয়ার, কমেন্ট, মেইল বা প্রিন্ট করুন

Leave a Reply