বাংলায় টাইপ করার নিয়ম

সর্বশেষ আপডেট:

বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। আর বাংলাদেশের সরকারি ভাষাও বটে। তাই ব্যক্তিগত কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন কাজে আমাদের বাংলায় টাইপ করার প্রয়োজন পড়ে। তো চলুন জেনে নিই বাংলায় টাইপ করার আদ্যোপান্ত।

কম্পিউটারে বাংলায় টাইপ করার জনপ্রিয় দু’টি সফটওয়্যার হলো – ‘বিজয়’ এবং ‘অভ্র’। বাংলায় টাইপ করার জন্যে ‘বিজয়’ অথবা ‘অভ্র’ যেকোনো একটি সফটওয়্যার ইন্সটল করা থাকতে হবে। ইতোমধ্যে সফটওয়্যারগুলো ইন্সটল করা না থাকলে ইন্সটল করে নিতে হবে।

অভ্র সফটওয়্যারটি এই লিংক থেকে ডাউনলোড করে নিয়ে ইন্সটল করা যেতে পারে। আর এই লিংকে পাওয়া যাবে বিজয়ের বিভিন্ন ভার্সন “বিজয় একুশে”, “বিজয় বায়ান্নো”, “বিজয় একাত্তর”, “বিজয় লিনাক্স” ইত্যাদি। বিজয় ব্যবহারের জন্যে লাইসেন্সের প্রয়োজন হবে।

ক্যারেক্টার এনকোডিং এবং ফন্ট নির্বাচন:

এনসি (ANSI) এবং ইউনিকোড (Unicode) – বাংলায় টাইপ করার জন্যে এ দু’ধরনের এনকোডিং (Character Encoding) ব্যবহৃত হয়।

১। এনসি (ANSI): এ ফন্টগুলো মূলত ইংরেজি/ল্যাটিন বর্ণ ও চিহ্নগুলোকে বাংলা চিহ্নের আকারে দেখায়। এজন্যে এ পদ্ধতি অনেক জায়গায়, বিশেষত যেখানে ফন্ট সিলেক্ট করা যায় না, সেখানে ব্যবহার করা যায় না। যেমন, এনসি পদ্ধতির একটি বহুল ব্যহৃত ফন্ট হলো “SutonnyMJ”। মাইক্রোসফট ওয়ার্ডে “SutonnyMJ” ফন্টে লিখিত কোনো টেক্সট-এর ফন্ট “Times New Roman”-এ পরিবর্তিত করে দিলেই বাংলার পরিবর্তে মূল ইংরেজি টেক্সট (Text) দেখা যাবে।

এনসি পদ্ধতির কয়েকটি বাংলা ফন্টের নাম নিচে দেয়া হলো।

  • SutonnyMJ
  • BrahmaputraMJ
  • Kalpurush ANSI

২। ইউনিকোড (Unicode): এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন ভাষার চিহ্নগুলোকে ইউনিক (Unique) কোড দ্বারা নির্দেশ করা হয়েছে। ফলে Unicode-এ বাংলা লিখলে, ইউনিকোড সমর্থিত যে কোনো ডিভাইসে তা বাংলা বর্ণের আকারেই দেখাবে।

ইউনিকোড পদ্ধতির কয়েকটি বাংলা ফন্টের নাম নিচে দেয়া হলো।

  • Kalpurush
  • Nikosh
  • SolaimanLipi
  • AdorshoLipi

OmicronLab, Ekushey (একুশে) ইত্যাদি ওয়েবসাইটে বিভিন্ন স্টাইলের কিছু Unicode Font দেয়া আছে। সেগুলো ডাউনলোড করে ইন্সটল করে নেয়া যেতে পারে।

এনসি ও ইউনিকোডে বাংলা লেখার সুবিধা-অসুবিধা:

দু’ধরনের এনকোডিং-এরই কিছু সুবিধা ও অসুবিধা রয়েছে। কিছু কিছু কাজ এনসি’তে করা সুবিধাজনক, অন্যকাজগুলো ইউনিকোডে সুবিধাজনক।

  1. এনসি অনেক পুরনো হওয়ায় এর অনেক ধরন (Style)-এর ফন্ট রয়েছে। ইউনিকোডে স্টাইলের সংখ্যা তুলনামূকভাবে কম।
  2. এনসি’তে একই ফন্ট ব্যবহার করে একই চিহ্নের বিভিন্ন রূপগুলো (Variation) দেখানো সম্ভব। যেমন, উ-কারের তিনটি রূপ হলো – ক) বর্ণের নিচে তেরছা ৭-এর মতো, খ) বর্ণের নিচে ৩-এর মতো এবং বর্ণের ডানপাশে ৩-এর মতো। এনসি পদ্ধতিতে কোনো শব্দে কেউ নিজের ইচ্ছে ও পছন্দমতো (Preference) রূপগুলো ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু ইউনিকোডে ফন্টের পূর্বনির্ধারিত রূপটিই বাধ্যতামূলকভাবে ব্যবহার করতে হয়।
  3. অন্যদিকে এনসি’তে একই ফন্ট ব্যবহার করে বাংলার সাথে সাথে ইংরেজি বা অন্য লিপিতে টাইপ করা যায় না। তাই একাধিক ভাষাতে টাইপের ক্ষেত্রে বারবার ফন্ট পরিবর্তনের ঝামেলা পোহাতে হয়। ইউনিকোডে এ ধরনের কোনো সমস্যা নেই।
  4. অটো-কারেক্ট (Auto Correct) ও বানান পরীক্ষণের (Spelling Checker) মতো বিষয়গুলো এনসিতে সম্ভব নয়। বরং এ অপশনগুলো এনসি মোডে টাইপের ক্ষেত্রে আরো ঝামেলা সৃষ্টি করে।
  5. বাচ্চাদের আদর্শলিপি তৈরি সহ কিছু কিছু কাজে কাঙ্ক্ষিত চিহ্নটিকে আলাদাভাবে রঙিন করার প্রয়োজন পড়ে। প্রত্যেকটি চিহ্নকে বিশেষ করে কার, ফলা, হসন্ত, অনুস্বার, বিসর্গ, চন্দ্রবিন্দু ইত্যাদিকে আলাদাভাবে সিলেক্ট করে রঙিন করা সহ অন্যান্য স্টাইলের কাজ করাটা এনসিতে খুবই সহজ। ইউনিকোডে এভাবে রঙিন করা যায় না। যেমন “কা”-এর আ-কারকে ইউনিকোডে আলাদাভাবে সিলেক্ট করা ও রঙিন করা যায় না।
  6. নোটপ্যাড বা এরকম অনেক জায়গায় যেখানে ফন্ট সিলেক্ট করা যায় না, সেখানে এনসি বাংলা টেক্সট উপযোগী নয়। অন্যদিকে ইউনিকোডে এ ধরনের কোনো ঝামেলা নেই।

তাই খুব বেশি স্টাইলের দরকার না হলে ইউনিকোডে টাইপ করাই ভালো। সম্ভবত এসব দিক বিবেচনা করেই সরকার বেশ কয়েক বছর আগে সব সরকারি দপ্তরে ইউনিকোড পদ্ধতি ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে।

বিজয় দিয়ে এনসি (ASNI) পদ্ধতিতে বাংলা টাইপ করা:

  1. বিজয় সফটওয়্যারটি ইতোমধ্যে চালু (Open) করা না হয়ে থাকলে প্রথমেই তা চালু করে নিতে হবে।
  2. Ctrl + Alt + B কি’গুলো একসাথে চেপে Bijoy Classic মোড-এ যেতে হবে। আবার বিজয় টুলবারেরর ড্রপডাউন লিস্ট থেকে “Bijoy Classic” সিলেক্ট করেও Bijoy Classic মোডে যাওয়া যায়।
  3. ফন্ট হিসেবে SutonnyMJ বা এ ধরনের এনসি বাংলা ফন্ট সিলেক্ট করতে হবে। এখন টাইপ করলে বাংলায় টাইপ হবে। বিজয়ে বাংলা টাইপ করার বিস্তারিত নিয়ম জানতে এই নিবন্ধটি দেখা যেতে পারে।

বাংলার পরিবর্তে আবার ইংরেজিতে টাইপ করতে হলে পুনরায় Ctrl + Alt + B কি’গুলো একসাথে চেপে কিংবা ড্রপডাউন লিস্ট থেকে “English” মোডে যেতে হবে। এবং ফন্ট হিসেবে যেকোনো ইংরেজি ফন্ট সিলেক্ট করতে হবে।

বিজয় ক্ল্যাসিক পদ্ধতিতে টাইপের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়। যেমন, নোটপ্যাড বা এ জাতীয় যেসব সফটওয়্যারে ফন্ট সিলেক্ট করা যায় না, সেগুলোতে এ পদ্ধতিতে বাংলা টাইপ কার্যকর নয়। কেননা সেক্ষেত্রে টাইপকৃত টেক্সটগুলো মূল ইংরেজি বর্ণের আকারে দেখায়। নোটপ্যাডে বাংলা টাইপ করতে হলে ইউনিকোড পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। আরেকটি বিষয় হলো, যেহেতু টেক্সটগুলো মূলত ইংরেজিতে টাইপ হয়, সেহেতু মাইক্রোসফট ওয়ার্ডে AutoCorrect অপশনটি বন্ধ করে দিতে হয়। নাহলে অনেক সময় টাইপকৃত টেক্সট পরিবর্তিত হয়ে যায়।

বিজয় দিয়ে ইউনিকোড (Unicode) পদ্ধতিতে বাংলা টাইপ করা:

  1. বিজয় সফটওয়্যারটি চালু (Open) করা না থাকলে প্রথমেই তা চালু করে নিতে হবে।
  2. Ctrl + Alt + V কি’গুলো একসাথে চেপে Bijoy Unicode মোড-এ যেতে হবে। আবার বিজয় টুলবারেরর ড্রপডাউন লিস্ট থেকে “Unicode” সিলেক্ট করেও Bijoy Unicode মোডে যাওয়া যায়।

এখন টাইপ করলে বাংলায় টাইপ হবে। এক্ষেত্রে সিস্টেমের ডিফল্ট ইউনিকোডিক বাংলা ফন্টে টেক্সটগুলো দেখাবে। মাইক্রোসফট ওয়ার্ড বা এ জাতীয় যেসব সফটওয়্যারে ফন্ট পরিবর্তনের সুযোগ আছে, সেগুলোতে ইচ্ছে করলে নিজস্ব ফন্টও ব্যবহার করা যায়। বিজয়ে বাংলা টাইপ করার বিস্তারিত নিয়ম জানতে এই নিবন্ধটি দেখা যেতে পারে।

বাংলার পরিবর্তে আবার ইংরেজিতে টাইপ করতে হলে পুনরায় Ctrl + Alt + V কি’গুলো একসাথে চেপে কিংবা ড্রপডাউন লিস্ট থেকে “English” মোডে যেতে হবে।

বিজয়ের ইউনিকোড মোডে টাইপের ক্ষেত্রে সমস্যাসমূহ:

“বিজয়”-এ Unicode মোডে টাইপ করতে কিছু কিছু সমস্যা হয়। যেমন-

  • রেফ টাইপ করার সময় সাথে সাথে (Immediately) এটি রেফ আকারে (অক্ষরের উপরে) দেখায় না।
  • ও-কার, ঔ-কার টাইপ করতে একাধিক Key ব্যবহার করতে হয়। যেমন- “নো” টাইপ করতে, এ-কার + ন + আ-কার, এই তিনটি Key ব্যবহার করতে হয়।
  • ই-কার, এ-কার, ঐ-কার, ও-কার, ঔ-কার ইত্যাদি সম্বলিত বর্ণ বা যুক্তবর্ণ ভুল করে ফেললে একাধিকবার Backspace চাপতে হয়। যেমন- “বান্ডিল” টাইপ করতে গিয়ে ভুলে ই-কার বাদে “বান্ডল” টাইপ করে ফেললে কয়েকবার Backspace চেপে “বা” পর্যন্ত এসে আবার টাইপ করতে হয়।
  • MicroSoft Word-এ বিজয়ে টাইপ করলে শব্দের নিচে লাল-লাল দাগ দেখায়।
  • নাম্বার প্যাড ব্যবহার করে বাংলা সংখ্যা টাইপ করা যায় না। অবশ্য লেআউট ফাইলটি এডিট করে এ সমস্যা দূর করা যায়।

উপরিউক্ত সমস্যাগুলোর কারণে আমি ব্যক্তিগতভাবে “বিজয়” ব্যবহার করি না। তার বদলে “অভ্র” ব্যবহার করি, যেখানে উক্ত কোনো ধরনের সমস্যা নেই।

অভ্র’তে ইউনিকোডে বাংলা টাইপিং:

আমার মতে, ইউনিকোডে বাংলা টাইপের ক্ষেত্রে অভ্রের ব্যবহার সবচে’ সহজ ও যুক্তিযুক্ত।

  1. ইতোমধ্যে না করা হয়ে থাকলে, অভ্র ডাউনলোড করে ইন্সটল করে নিতে হবে। এবং অভ্র সফটওয়্যারটি চালু করতে হবে।
  2. F12 কি’টি চেপে বাংলা মোডে যেতে হবে।
  3. অভ্রে বাংলা টাইপের ক্ষেত্রে অভ্র ফনেটিক (Avro Phonetic), অভ্র মাউস (Avro Mouse) এবং ফিক্সড্ লেআউট (Fixed Layout) – এ তিন ধরনের পদ্ধতি রয়েছে। সুবিধামতো বাংলা টাইপের পদ্ধতি বাছাই করে সহজেই টাইপিং করা যায়। বিস্তারিত জানতে “অভ্র” সফটওয়্যারের মাধ্যমে বাংলায় টাইপিং নিবন্ধটি দেখা যেতে পারে।

মোবাইলে বাংলা লেখার কিবোর্ড অ্যাপ:

মোবাইল বা স্মার্টফোনে এনসি এনকোডিং প্রযোজ্য নয়। সেক্ষেত্রে শুধু ইউনিকোডে বাংলা টাইপ করতে হয়। নিচে কিছু অ্যাপের নাম দেয়া হলো যেগুলোর সাহায্যে অ্যান্ড্রয়েড ফোনে সহজে বাংলা টাইপ করা যায়।

আইওএস (IOS) অপারেটিং সিস্টেমের উপযোগী কিবোর্ড:

কিবোর্ডগুলোর তুলনা:

জিবোর্ডরিদমিকপার্বতীস্বরচক্রবিজয়
লেআউট কাস্টমাইজেশনহ্যাঁ
ভয়েস টাইপিংহ্যাঁহ্যাঁ
ফনেটিক টাইপিংহ্যাঁ
অটোফিল/ সাজেশনহ্যাঁহ্যাঁবাগি
ক্লিপবোর্ডহ্যাঁ
ইমোজিহ্যাঁহ্যাঁহ্যাঁ
নাম্বার প্যাডহ্যাঁহ্যাঁ

শেয়ার, কমেন্ট, মেইল বা প্রিন্ট করুন

Leave a Reply